জাপানের শ্রমবাজারে বড় সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ। দেশটিতে আগামী বছরগুলোতে এক কোটিরও বেশি দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে এমন তথ্য সামনে আসার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আগামী সাত দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক প্রস্তুতিমূলক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যাহ ভূঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কেন জাপান এখন বড় সুযোগ?
জাপানে দ্রুত কমছে তরুণ জনসংখ্যা। ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ যুবক শ্রেণির কর্মীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন অতিরিক্ত যুব শ্রমশক্তি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে জাপানে পাঠানোর বিষয়টিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
সভায় জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে জাপানে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে ২০টি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই জাপানমুখী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
অদক্ষ থেকে দক্ষ: বদলাতে হবে কৌশল
সভায় আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারে মূলত অদক্ষ শ্রমিক সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু জাপানের মতো উন্নত দেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মী।
তাই নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে:
- নির্দিষ্ট ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ
- জাপানি ভাষা শিক্ষা
- আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা সনদ
- কর্মপূর্ব সাংস্কৃতিক ও আচরণগত প্রশিক্ষণ
জাপানের শ্রমবাজার ধরতে হলে শুধুমাত্র সংখ্যায় নয়, দক্ষতায়ও এগিয়ে থাকতে হবে এমন মত দেন উপস্থিত কর্মকর্তারা।
৫৩টি টিটিসিতে জাপানমুখী প্রশিক্ষণ
আগে ৩৩টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে টিটিসি জাপানমুখী ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু ছিল। এখন জাপানের চাহিদা বিবেচনায় আরও ২০টি টিটিসি যুক্ত করে মোট ৫৩টিতে জাপানি ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাপানি ভাষা শিক্ষকের ঘাটতি। সভায় এ বিষয়ে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ উদ্যোগ নেওয়ার আলোচনা হয়। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২০০টি বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জাপানি ভাষা শেখাচ্ছে। বিদেশে কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর সহযোগিতাও নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে দ্রুত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়।
সাত দিনের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার অবস্থানে নিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
এই লক্ষ্যে:
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে
- স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে
- শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের মতামত নেওয়া হবে
- প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হবে
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
তরুণদের জন্য কী বার্তা?
সরকারি সূত্র বলছে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে তরুণদের এখন থেকেই দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে—
- কারিগরি শিক্ষা
- ভাষা দক্ষতা (বিশেষ করে জাপানি)
- প্রযুক্তিগত ট্রেড
- স্বাস্থ্যসেবা ও নির্মাণ খাত
এই খাতগুলোতে প্রশিক্ষণ নিলে জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
সামনে কী?
জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রতিযোগিতায় রয়েছে আরও অনেক দেশ। তাই দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়া না হলে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বিবেচনায় সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সফল হয়, তবে এটি শুধু রেমিট্যান্স বৃদ্ধি নয় দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এখন নজর সাত দিনের কর্মপরিকল্পনার দিকে। জাপানের বিশাল শ্রমবাজার ধরতে কতটা কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
Apply Click